
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জননেতা তারেক রহমান দেশের মাটিতে পা রেখে মাটি স্পর্শ করার প্রতীকী দৃশ্যটি ছিল গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনীতি কেবল ক্ষমতার হিসাব নয়। এটি মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের দায়বদ্ধতা। তারেক রহমান সেই মুহূর্তে যেন ঘোষণা করলেন, তাঁর রাজনীতি প্রতিশোধের নয়, পুনর্গঠনের। ধ্বংসের নয়, উন্নয়নের। বিভাজনের নয়, ঐক্যের। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ বক্তৃতার ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বললেন ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জনগণ, গণতন্ত্র এবং টেকসই উন্নয়ন।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা কেবল একটি সমাবেশ বা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা হয়ে ওঠে একটি সময়ের প্রতীক, একটি নতুন যাত্রার সূচনাবিন্দু। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর পূর্বাচলে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসমাবেশ এবং সেখানে উচ্চারিত ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর মাই কান্ট্রি’ উচ্চারণটি তেমনই এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি কোনো আবেগনির্ভর স্লোগান নয়; বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, অভিজ্ঞতা ও আত্মোপলব্ধির ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা এক সুসংহত রাষ্ট্রচিন্তার ঘোষণা।
তারেক রহমানের বক্তৃতার শুরুতেই মহান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসের কথা উচ্চারিত হয়। একজন মুসলমান নেতা হিসেবে নিজের বিশ্বাসের জায়গাটি স্পষ্ট করলেও তিনি কোনোভাবেই রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঠেলে দেননি। বরং তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সকল ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপদ আবাসভূমি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার তাঁর বক্তব্য ছিল সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। একই সঙ্গে তিনি পাহাড়ি ও সমতলের জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার ন্যায্য বণ্টনের কথা তুলে ধরেন, যা দীর্ঘদিনের অবহেলার এক বাস্তব স্বীকারোক্তি।তার বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের কথা একই সূত্রে গাঁথেন। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। স্বাধীনতার চেতনা কেবল অতীতের গৌরব নয় বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দায়িত্ববোধ। ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে যারা গুম, খুন, হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি সেই ত্যাগকে রাষ্ট্রীয় স্মৃতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। সমাবেশে তারেক রহমান যে রাষ্ট্রচিন্তার রূপরেখা তুলে ধরেন, তা ছিল বহুমাত্রিক।
শিক্ষার্থী, তরুণ, যুবক, শ্রমিক, কৃষক—সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কথা তিনি আলাদাভাবে উল্লেখ করেন। শিক্ষার মানোন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি ও শিল্পে আধুনিকায়ন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা, এসব বিষয় তাঁর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উঠে আসে।
তিনি মাদরাসা শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বোঝান যে, রাষ্ট্র গঠনে জ্ঞানচর্চা ও মুক্ত গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। তার বক্তব্যের সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, দীর্ঘ নির্যাতন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের পরও তিনি কোন প্রতিশোধের ভাষা প্রয়োগ করেননি। চোখে-মুখে ছিল না ক্রোধের আগুন, ছিল দায়িত্ববোধের দৃঢ়তা। এটি একটি পরিণত রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিচায়ক। তিনি বুঝিয়ে দেন, রাষ্ট্র পরিচালনা মানে অতীতের ক্ষত গুনে গুনে প্রতিশোধ নেওয়া নয় বরং সেই ক্ষত থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা।
তার ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বক্তব্যে অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনাও ইঙ্গিতপূর্ণ ছিল। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, জবাবদিহিমূলক সরকার ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে রাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব এসব বিষয় একটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক শর্ত। তিনি ইঙ্গিত দেন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ কেবল ভাতের ব্যবস্থা নয়। এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার সমন্বিত প্রয়াস। এই পরিকল্পনার আরেকটি স্তম্ভ হলো গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার রক্ষা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এসব ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। তারেক রহমানের বক্তব্যে এই উপলব্ধির প্রতিফলন ছিল স্পষ্ট। তিনি এমন একটি বাংলাদেশ কল্পনা করেন, যেখানে রাষ্ট্রের শক্তি নাগরিকের অধিকারকে রক্ষা করবে, কোন ভাবেই দমন করবে না। সবশেষে, তাঁর বক্তব্যে যে আশাবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছে, তা নিছক কল্পনাবিলাস নয়। এটি জনগণের অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা। তিনি আহ্বান জানান, পরনিন্দা, পরচর্চা, হিংসা ও দুর্নীতি পরিহার করে সবাইকে কাজের রাজনীতিতে যুক্ত হতে। একটি জাতি তখনই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, যখন তার নাগরিকরা সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, সবার সহযোগিতায় দেশনায়কোচিত নেতৃত্বে একটি স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে উঠুক, যেখানে সমান অধিকার, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত হবে। জননেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে দুর্নীতি, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত এক সুখী, সমৃদ্ধশালী এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।এটাই আজ দেশের আপামর জনসাধারণের সঙ্গে আমাদেরও প্রত্যাশা।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ প্রতিদিন ও কলামিস্ট।































































